চামড়া ঝুলে যাওয়া প্রতিরোধের উপায়

Screenshot 2026-09-02 022248

বয়সের আগেই চামড়ায় ভাঁজ পড়ছে? জেনে নিন এই সমস্যার কারণ ও প্রতিকার।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের সতেজতা ও টানটান-ভাব কমে যাওয়া স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।

তবে অনেকেই খেয়াল করেন মুখমণ্ডল, গলা, চোখের নিচের পাতা, হাত কিংবা পায়ের চামড়া হঠাৎ করে অতিরিক্ত পাতলা, কুঁচকানো এবং খসখসে কাগজের মতো রুক্ষ দেখাচ্ছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় কাগজের মতো কুঁচকে যাওয়া এই বিশেষ অবস্থাকে ‘ক্রিপি স্কিন’ বলা হয়। একে বার্ধক্যের সাধারণ লক্ষণ মনে করলেও, ত্বকবিশেষজ্ঞদের মতে এর পেছনে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি ও কোলাজেনের চরম অবক্ষয় দায়ী।

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক পোর্টাল ‘হেলথ’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ছোট কিছু বদল এবং চর্মরোগের আধুনিক থেরাপির মাধ্যমে এই ক্রিপি স্কিন পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত বোর্ড-প্রত্যয়িত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ব্রেন্ডন ক্যাম্প এবং স্বাস্থ্য গবেষক লরা স্কোবার ‘ক্রিপি স্কিনে’র মূল কারণ এবং দূর করার উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ক্রিপি স্কিন বা চামড়া কুঁচকে যাওয়ার ৪টি কারণ

ডা. ব্রেন্ডন ক্যাম্প বলেন, “চামড়া আলগা হয়ে ঝুলে পড়া এবং টানটান-ভাব বা ইলাস্টিন প্রোটিন নষ্ট হয়ে যাওয়াই ক্রিপি স্কিনের প্রধান লক্ষণ। এর কারণগুলো হল:

কোলাজেন ও ইলাস্টিন ক্ষয়: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের বাইরের স্তর বা ‘এপিডার্মিস’ পাতলা হয়ে যায়, কারণ শরীর প্রাকৃতিকভাবে ‘ইলাস্টিন’ তৈরি কমিয়ে দেয়। ফলে ত্বক তার স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা চিরতরে হারিয়ে ফেলে।

সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি: কড়া রোদের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির বিরুদ্ধে কোনো সুরক্ষা না নিলে, ত্বকের গভীরের কোলাজেন তন্তু পুড়িয়ে বার্ধক্যের গতি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ওজনের ঘন ঘন ওঠানামা: হঠাৎ অতিরিক্ত ওজন হ্রাস বা বার বার ওজনের তীব্র তারতম্যের কারণে ত্বকের চামড়া আলগা হয়ে ঝুলে পড়ে।

কর্টিকোস্টেরয়েড ওষুধের অপব্যবহার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘন ঘন কর্টিকোস্টেরয়েড ধরনের ক্রিমের অপব্যবহার করলে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে চামড়া স্থায়ীভাবে পাতলা বা ‘স্কিন অ্যাট্রোফি’ হয়ে ‘ক্রিপি’ রূপ ধারণ করে।

ঝুঁকির উপাদান: এছাড়াও ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং বিরল জেনেটিক রোগ ‘এহলারস-ড্যানলস সিন্ড্রোম’ কোলাজেন গঠনে বাধা দিয়ে এই রোগ দ্রুত করতে পারে।

ক্রিপি স্কিন দূর করার ঘরোয়া ও ক্লিনিক্যাল চিকিৎসা

চামড়ার এই খসখসে ভাব দূর করতে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা ঘরোয়া যত্নের পাশাপাশি ৫টি অত্যাধুনিক ক্লিনিক্যাল থেরাপির কথা জানিয়েছেন।

ঘরোয়া রূপচর্চায় রেটিনয়েড ও স্কিন-ফার্মিং ময়েশ্চারাইজার

ত্বকের কোলাজেন বাড়াতে এবং কোষের পুনর্গঠন দ্রুত করতে প্রতিদিন ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ রেটিনল বা রেটিনয়েড ব্যবহার করা উপকারী।

গবেষণায় দেখা গেছে, একটানা ১২ সপ্তাহ দিনে দুইবার সঠিক ‘স্কিন-ফার্মিং বডি ময়েশ্চারাইজার’ ব্যবহার করলে চামড়ার ঘনত্ব ও পুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়।

লেজার রিসারফেসিং ও আল্ট্রাসাউন্ড স্কিন টাইটনিং

‘ক্রিপি স্কিন’ যদি অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়, তবে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের চেম্বারে গিয়ে লেজার লাইট থেরাপি নেওয়া নিরাপদ, যার ‘টাইটনিং ইফেক্ট’ মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ পায়।

এছাড়া ‘নন-ইনভেসিভ আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি’ তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ত্বকের গভীরে কোলাজেন তৈরি করে ২ থেকে ৬ মাসের মধ্যে ঝুলে পড়া চামড়াকে টেনে লিফট করে দেয়।

মাইক্রোনিডলিং ও ফিলার ইনজেকশন

মাইক্রোনিডলিং পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম সুঁইয়ের নিয়ন্ত্রিত আঘাতের মাধ্যমে ত্বকের ক্ষত নিরাময় প্রক্রিয়াকে সচল করে কোলাজেন বাড়ানো হয়।

চোখের নিচের বা হাতের চামড়ার অতিরিক্ত গভীর খাঁজ পূরণ করতে ‘ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সিলঅ্যাপাটাইট’ বা হায়ালুরোনিক অ্যাসিডের ‘স্কিন ফিলার’ ইনজেকশন দেওয়া কার্যকর আধুনিক চিকিৎসা।

ফেইশল থ্রেড বা কসমেটিক সার্জারি

ঝুলে পড়া অতিরিক্ত চামড়াকে টেনে তুলতে কসমেটিক সার্জনরা ত্বকের নিচে বিশেষ থ্রেড বা সুতো প্রবেশ করিয়ে চামড়া লক করে দেন, যা ‘ফেইশল থ্রেডস’ নামে পরিচিত।

এটি কোলাজেন উদ্দীপিত করে ত্বকের ঘনত্ব বাড়িয়ে দেয়।

ক্রিপি স্কিন প্রতিরোধের জীবনযাত্রা

এসপিএফ ৩০ সানস্ক্রিন: রোদের পোড়াভাব থেকে কোলাজেন বাঁচাতে প্রতিদিন বাইরে বের হওয়ার আগে অবশ্যই এসপিএফ ৩০ বা এর বেশি মাত্রার ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন মাখা বাধ্যতামূলক।

ভিটামিন ডি৩ এবং ওরাল কোলাজেন: ল্যাবরেটরি সমীক্ষা অনুযায়ী, ভিটামিন ডি৩ সাপ্লিমেন্ট এর প্রদাহরোধী গুণের কারণে ডিএনএ মেরামত করে ত্বকের অকাল বার্ধক্য রোধ করে। এছাড়া ওরাল কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে তা বলিরেখা পড়ার গতি ধীর করে।

ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন: অকাল বার্ধক্যের হাত থেকে মুখের ত্বক রক্ষা করতে তামাক ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ বর্জন করা উচিত।

আর্দ্র থাকা: শুষ্কতা দূর করতে প্রতিদিন নিয়ম করে ভারী ময়েশ্চারাইজার মাখার পাশাপাশি, কোষের অভ্যন্তরীণ তরল চলাচল সচল রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।

Pin It