জরিমানার আদেশ নিয়ে মাহবুবের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বচসা

Screenshot 2026-09-09 030158-##

সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে একটি মামলায় আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ নিয়ে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী এবং আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে বচসার ঘটনা ঘটেছে। একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতিসহ পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এজলাস ছেড়ে চলে যান। মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আপিল বিভাগের আদালতকক্ষে এ ঘটনার পর আর আদালত বসেননি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চে এ সময় ছিলেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এবং বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি। ঘটনার পর সাংবাদিকদের সামনে এর বর্ণনা দেন ব্যারিস্টার খোকন, অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।

মাহবুব উদ্দিন খোকনের বক্তব্য : এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপিল বিভাগের এক নম্বর আইটেমে থাকা মামলায় সকালে নারী আইনজীবীকে কস্ট (খরচা আরোপ) দেওয়া হয়। জরিমানা করা হয় পাঁচ লাখ টাকা। আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় থাকা ১৩ নম্বর মামলা (আইটেম) শেষ হওয়ার পর প্রধান বিচারপতিকে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর মামলা খুব একটা হচ্ছে না আপিল বিভাগে।’

আইনজীবীদের আয় কমে গেছে উল্লেখ করে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘একজন জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা কস্ট দেওয়া অনেক বেশি হয়ে গেছে। তাকে মাফ করে দেন। তখন উনি বললেন, আমি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে। আমি তখন বললাম, ইনকাম ওই সেন্সে কমে গেছে…বোঝাতে চেয়েছি আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন। তিনটা বেঞ্চ ছিল। এখন একটা বেঞ্চ।’

হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে মাহবুব উদ্দিন খোকন আরও বলেন, ‘একটা মামলা স্টে হলে…সেখানে শুনানি করতে পারছি না। এমনকি চেম্বার আদালতে স্টে করছেন, তা হিয়ারিং করতে এক বছর লাগে। ওখানে কোনো মেনশন করা যায় না কেন, এই মামলাটা ওপরে ছিল (কজলিস্টে) নিচে গেল কেন। যেহেতু একটা বেঞ্চ, মানুষ দীর্ঘদিন থেকে ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না, মামলা শুনানি করতে পারছেন না। মামলা হলে আইনজীবীদের ইনকাম হবে।’ খোকন বলেন, ‘আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম, চিন্তা করিনি যে উনি এত রিঅ্যাক্ট করবেন। ওনাদের তো রাগ-অভিমানের ঊর্ধ্বে বিচার করার কথা। আর আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসাবে আমার অবলিগেশন আছে ওনার কাছে আইনজীবীদের পক্ষে আবেদন করার।’

ব্যারিস্টার খোকন দাবি করেন, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তার কোনো ‘তর্ক হয়নি’। আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসাবে তাদের স্বার্থের কথা বলা ‘তার দায়িত্ব’। তিনি বলেন, ‘আমি তো চিন্তা করি নাই যে মাননীয় প্রধান বিচারপতি এত রিঅ্যাক্ট করবেন। উনার তো রাগ-অভিমানের ঊর্ধ্বে থাকার কথা। আর লইয়ারদের প্রতিনিধি হিসাবে অবশ্যই আমার অবলিগেশন আছে উনার কাছে লইয়ারদের পক্ষে আবেদন করার।’

অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য : অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে আপিল বিভাগ একটি মামলায় আদেশ দেন। একই বিষয়ে একাধিক রিট আবেদন এবং আগের মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগে রিট আবেদনকারী মো. নূর আলম ও তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা (কস্ট) করা হয়। জরিমানার টাকা ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আদেশ দেওয়ার সময় ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তবে আইনজীবী সুফিয়া আহামেদ তখন তার পাশে বসেছিলেন এবং বারবার বলছিলেন, ‘খোকন ভাই আমাকে কী বিপদে ফেললেন।’

অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল বলেন, জরিমানা মওকুফের অনুরোধের পর প্রধান বিচারপতি জানান, আদালতের সঙ্গে ‘প্রতারণা এবং গুরুতর জালিয়াতির’ বিষয়টি বিবেচনা করেই আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং আদালত সেই আদেশ পরিবর্তন করবেন না। তিনি বলেন, ‘এরপর আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলে প্রধান বিচারপতি খোকনের কাছে জানতে চান, তিনি কি বলতে চাচ্ছেন যে, উনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরই আইনজীবীদের আয় কমে গেছে?’ কাজল বলেন, খোকন একই বক্তব্য আবার বলার চেষ্টা করলে প্রধান বিচারপতি তাকে বলেন, তার ওই বক্তব্য ‘অ্যাবসোলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল।’ এরপর প্রধান বিচারপতি জানান, তিনি আর আদালতে দিনের কার্যক্রমে অংশ নেবেন না। প্রধান বিচারপতি এরপর এজলাস থেকে উঠে যান বলে অ্যাটর্নি জেনারেল জানান।

অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল বলেন, প্রধান বিচারপতি সুপ্রিমকোর্টে আইনজীবীদের অভিভাবক। আদালতে আইনজীবীদের সঙ্গে বিচারকদের ভুল বোঝাবুঝি বা মতপার্থক্য হতে পারে, কিন্তু তা সাধারণত আদালতের কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তিনি বলেন, ব্যারিস্টার খোকন একজন সংসদ-সদস্য হওয়ায় তার কাছ থেকে এমন বক্তব্য ‘অপ্রত্যাশিত’ ছিল।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য : অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক জানান, ২০১৩ সালে অস্থায়ী কাজি নিয়োগকে কেন্দ্র করে এ মামলার সূত্রপাত। যাত্রাবাড়ী থানার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মো. নূর আলম ২০১৬ সালে রিট আবেদন করেন, রিট পিটিশন নম্বর ১৪৮২১। সেখানে অস্থায়ী নিয়োগ স্থায়ী করার আবেদন করা হয় এবং স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির নিয়োগ বাতিল চাওয়া হয়। ওই মামলায় নূর আলম হাইকোর্টে হেরে যাওয়ার পর বিষয়টি আপিল বিভাগে যায়। আপিল বিভাগ অস্থায়ী নিয়োগ বাতিল করে স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বহাল রাখার আদেশ দেন।

অনীক আর হক বলেন, এরপর ২০১৮ সালে ১৬০৮৮ নম্বর রিট আবেদন করা হয়। আগের মামলাগুলোর তথ্য গোপন করে ২০২১ সালে ১১৪৪৬ নম্বর এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৯৬৩১ নম্বর রিট আবেদন করা হয়। এসব মামলার কোনোটিতেই আগের মামলার আদেশ এবং আপিল বিভাগের আদেশের বিষয়ে বলা হয়নি। এর মধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিবের বিরুদ্ধেও আদালত অবমাননার আবেদন আনা হয়। তিনি বলেন, বিষয়টি একদিনে নিষ্পত্তি হয়নি; টানা তিন দিন শুনানি হয়েছে। শুনানির সময় আপিল বিভাগের রেকর্ড ও পুরোনো ফাইল তলব করে দেখা হয়, একই বাদী ও একই আইনজীবী পরপর একাধিক রিট আবেদন করেছেন এবং আগের মামলাগুলোর তথ্য গোপন করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রিট আবেদনকারী এবং তার আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা করে জরিমানা করেন বলে জানান অনীক। তিনি বলেন, জরিমানা করার সময় সংশ্লিষ্ট নারী আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি কোনো ‘উচ্চবাচ্য না করে’ আদালতের আদেশ মেনে নেন।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দাবি, প্রায় তিন ঘণ্টা পর ব্যারিস্টার খোকন বিষয়টি নিয়ে আদালতে কথা বলেন। তখন ওই নারী আইনজীবী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না যে এখানে ওই নারী আইনজীবী কোনো কিছু করেছেন। মাহবুব উদ্দিন খোকন সাহেব সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে এই কাজটি করেছেন।’ অনীক আর হক বলেন, ব্যারিস্টার খোকন এসব মামলায় ফাইলিং আইনজীবীর সিনিয়র হিসাবে যুক্ত ছিলেন।

Pin It