শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগের একাংশের হতাশা

Screenshot 2026-09-09 043900

সোমবার রাতের ওই বৈঠকে উপস্থিত একজন নেতা বলেন, “সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগকে তো তিনি (শেখ সেলিম) নষ্ট করেছেন। দলের বিভিন্ন স্তরে উনার জন্য বিতর্কিত লোকজন প্রবেশ করেছে।”

শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সভাপতিত্ব করার ইঙ্গিতে দলের একটি অংশের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

সোমবার রাতে কলকাতার নিউ টাউনে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই, সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিনের বাসায় এক বৈঠকে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা প্রকাশ্যেই এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল হাসান রিপনসহ ৮-১০ জন নেতা ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল এর এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকারকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দলের দায়িত্বে শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে নিয়ে আসার কথা বলার পর থেকেই দলের এ অংশের নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।

দ্য ওয়ালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, “এখন শেখ সেলিম সিনিয়র মোস্ট প্রেসিডিয়াম সদস্য। আমার অনুপস্থিতিতে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।”

সোমবার রাতের বৈঠকে উপস্থিত একজন আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, একজন কেন্দ্রীয় নেতা সেখানে দলীয় সভাপতির সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিজের অস্বস্তির কথা শেখ হেলালের সামনে তুলে ধরেন।

এ সময় অন্যরাও আলাদা আলাদাভাবে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে দীর্ঘ দিন ধরে শেখ সেলিমের অনুপস্থিতির পাশাপাশি নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এর মধ্যে একজন তখন সবার উদ্দেশে বলেন, “সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগকে তো তিনি (শেখ সেলিম) নষ্ট করেছেন। দলের বিভিন্ন স্তরে উনার জন্য বিতর্কিত লোকজন প্রবেশ করেছে। নেতাকর্মীদের সঙ্গে উনি কোনো সময় ভালো ব্যবহার করেছে–এটা তো কেউ দেখেনি। গত পনেরো বছরে তদবির ছাড়া কোনো দলীয় কাজে উনাকে পাওয়া যায়নি।”

ওই নেতা শেখ হেলালকে বলেন, “সেলিম ভাই তো কখনোই দলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখেননি, তাহলে উনাকে কেন সভাপতির দায়িত্ব দিতে হবে? এটা আমরা মানলেও কেউ মানবে না। আপনি আপাকে বিষয়টা ভালো করে বোঝাতে পারবেন, আমরা আশা করি আপনি এখন এই বিষয়ে আপার (শেখ হাসিনা) সাথে কথা বলবেন। উনি (শেখ সেলিম) ছাড়া কি আর কেউ নাই?”

আরেকজন নেতা বলেছেন, শেখ হেলালের বাসায় রাতের এই জমায়েত মূলত ছিল আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানককে ‘বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে তুলে ধরার বৈঠক।

ওই নেতা বলেন, “পার্টিতে শেখ সেলিম ভাই বলেন, বর্তমানে সিনিয়র নেতা কে সেটা নিয়ে প্রশ্ন যেমন নাই, তেমনি সাংগঠনিকভাবে উনাকে নেতাকর্মীরা দেখে নাই। আর নানক ভাই তো এই পার্টিকে ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে। এটাই আমরা উনার কাছে তুলে ধরতে চেয়েছি, নেত্রী যেন বিষয়টায় গুরুত্ব দেয়।”

শেখ হেলাল আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে সবার বক্তব্য তুলে ধরার এবং সমাধানের চেষ্টা করার আশ্বাস দেন বলে বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্রের ভাষ্য।

শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার আপন ফুফাতো ভাই। তার মা শেখ আছিয়া বেগম ছিলেন শেখ হাসিনার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বোন।

আর শেখ হেলাল উদ্দিন বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ আবু নাসেরের ছেলে। সেই হিসেবে তিনি শেখ হাসিনার আপন চাচাতো ভাই।

শেখ সেলিমের বড় ছেলে শেখ ফজলে ফাহিম বিয়ে করেছেন আলোচিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের মেয়ে ন্যান্সি জাহারাকে। ন্যান্সির ভাই ববি হাজ্জাজ বর্তমানে বিএনপি সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী।

আর শেখ সেলিমের ছোট ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নাঈমের বিয়ে হয়েছে বিএনপি নেতা এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর মেয়ে সারাহ হাসিন মাহমুদের সঙ্গে।

আত্মীয়তার এই সম্পর্কের কারণেও আওয়ামী লীগের একটি অংশের মধ্যে শেখ সেলিমের ব্যাপারে সন্দেহ ও অবিশ্বাস রয়েছে।

আবার শেখ হেলালের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির নেতা আন্দালিভ রহমান পার্থর, যিনি এখন বিএনপি সরকারের তথ্যমন্ত্রী।

তবে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিমকে সভাপতি করার ইঙ্গিতে দলের আরেকটি অংশ খুশি। তারা শেখ সেলিমের বিশ্বস্ত হিসেবে দলে পরিচিত।

তাদের মধ্যে রয়েছেন শেখ সেলিমের দুই ভাতিজা শেখ ফজলে শামস পরশ ও শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ হাসিনার আরেক ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, শেখ সেলিমের ভগ্নিপতি ওমর ফারুক চৌধুরী এবং শেখ হাসিনার ফুফাতো বোনের ছেলে নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন ও মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন।

শেখ হাসিনার উত্তরসূরি নির্বাচন এবং শেখ পরিবারের আত্মীয়দের মধ্যে বিভাজন নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন।

তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সভাপতির অনুপস্থিতিতে সভাপতি মণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্যের সভাপতিত্ব করার কথা। সে কথাই শেখ হাসিনা দ্য ওয়ালকে বলেছেন।

“আপনি কমিটিটা দেখেন, সেখানে শেখ সেলিমই সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠতম সদস্য,” বলেন এস এম কামাল।

২০২২ সালের ২৪ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলনে ৮১ সদস্যের কমিটিতে টানা দশমবারের মত সভাপতি হন শেখ হাসিনা। আর ওবায়দুল কাদের তৃতীয়বারের মত সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

তখন যে সভাপতিমণ্ডলী ছিল, তার জ্যেষ্ঠতম দুই সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও বেগম মতিয়া চৌধুরী ইতোমধ্যে মারা গেছেন।

এরপর আছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফর উল্লাহ, পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য, মো. আব্দুর রাজ্জাক, মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, কামরুল ইসলাম, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, জেবুন্নেছা হক, এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ও সিমিন হোসেন রিমি।

তাদের মধ্যে কাজী জাফর উল্লাহ, ফারুক খান ও শাজাহান খান কারাগারে আছেন। শেখ সেলিমের পাশাপাশি ভারতে অবস্থান করছেন মায়া ও নানক। আব্দুর রহমান আছেন যুক্তরাজ্যে।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তার অনুপস্থিতিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

ওই বিচারকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে আসা শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরেই তিনি দেশে ফিরতে চান। অবশ্য দেশে ফিরলে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথাও তিনি দ্য ওয়ালকে বলেছেন।

Pin It